Home National এসি বিস্ফোরণে নিভে গেলো মেহের আলীর ‘নয়নের’ আলো

এসি বিস্ফোরণে নিভে গেলো মেহের আলীর ‘নয়নের’ আলো

6
0

ভূমিহীন দিনমজুর মেহের আলীর সংসারে আলো জ্বালানো সন্তান শুকর আলী নয়ন (২৬) নারায়ণগঞ্জের মসজিদের এসি বিস্ফোরণে নিহতের খবরে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো গ্রাম।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঢাকা শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত শুকর আলী নয়ন লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার তালুক পলাশী কৈটারী গ্রামের ভূমিহীন দিনমজুর মেহের আলীর বড় ছেলে।

নিহতের পরিবার ও গ্রামবাসী জানান, ভূমিহীন দিনমজুর মেহের আলীর তিন ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে শ্বশুর মৃত খতিবুদ্দিনের বাড়িতে ঘরজামাই থাকতেন। বাবার অভাবের সংসারে হাল ধরতে ১৩ বছর আগে ৫ম শ্রেণি পাস করে ঢাকায় পাড়ি জমায় শুকর আলী নয়ন। সেই থেকে ঢাকা নারায়ণগঞ্জের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে নয়ন। সেখানকার আয়ে একমাত্র বোনের বিয়ে এবং ছোট দুই ভাইকে হাফেজিয়া মাদরাসায় পড়ানোসহ সংসারের যাবতীয় খরচ চালাতেন নয়ন। এভাবে নয়নের আলোয় আলোকিত হতে শুরু করে ভূমিহীন মেহের আলীর সংসার।

ভূমিহীনের খাতা থেকে বাবার নাম কেটে দিতে সাম্প্রতি সময় ১৪ শতাংশ জমি ক্রয় করে একটি মাত্র টিনের ঘর তুলে বাবা মায়ের বসবাসের ব্যবস্থা করেন নয়ন। সেই জমির পুরো টাকা পরিশোধ না হওয়ায় তা রেজিস্ট্রি করে নিতে পারেন নি তিনি। কথা ছিলো ধিরে ধিরে টাকা পরিশোধ হলে জমি রেজিস্ট্রি করে দিবেন জমির মালিক খালাত ভাই ওবায়দুল। কিন্তু সেই টাকা পরিশোধ না হতেই মেহের আলীর সংসারের আলো জ্বালানো প্রদীপটি চিরতরে নিভে গেছে।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাতে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পশ্চিমতল্লা এলাকার বাইতুস সালাত জামে মসজিদের এয়ার কন্ডিশনার (এসি) বিস্ফোরণের ৩৭জন দগ্ধ হন। সেখানে দগ্ধ হয়ে ঢাকা শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন পোশাক শ্রমিক শুকর আলী নয়ন। সেখানে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হেরে না ফেরার দেশে চলে যান নয়ন। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নয়নের মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌছলে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে পুরো কৈটারী গ্রাম।

প্রিয় সন্তানের দগ্ধ নিথর দেহ দেখতে অপেক্ষা করছেন বৃদ্ধ বাবা মেহের আলী ও গ্রামবাসী আত্নীয়-স্বজন। সংসারের প্রদীপকে হারানোর শোকে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন বাবা মেহের আলী। ছেলেকে হারানোর শোকে পাথর হয়ে গেছেন তিনি। গ্রামবাসী ও স্বজনরাও তাকে সান্তনা দেয়ার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছেন। তাদের আহাজারীতে পুরো গ্রামের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। সবার প্রতীক্ষা নয়নের নিথর দেহ একপলক দেখার। নয়নের মরদেহ হস্তান্তর হয়েছে। গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। পৌছলে স্থানীয় পলাশী বাজার কেন্দ্রীয় কবর স্থানে তাকে দাফন করা হবে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।

নয়নের গ্রামের বন্ধু জয়নাল আবেদীন জানান, বোনের বিয়ে দেয়ার পরে বাড়ি করার জমি ক্রয় করে নয়ন। সেই জমির টাকা পরিশোধ করে রেজিস্ট্রি করে নিয়ে নিজে বিয়ে করতেন নয়ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন তার পুরন হয়নি। গ্রামের সকলের প্রিয় ছিল নয়ন।

নয়নের মামি শরীফা বেগম জানান, বাবার অন্ধ সংসারটির হাল ধরে আলোকিত করে তোলে নয়ন। বোনের বিয়ে ছোট ভাইদের লেখাপাড়া ও সংসার খরচ সবই ছিল নয়নের টাকায়। এখন এ সংসার কিভাবে চলবে?

নয়নের বাবা মেহের আলী বলেন, নামাজে যাওয়ার আগেও মোবাইলে বাড়ির খবর নিয়েছে নয়ন। বলেছিল- বাবা এখন নামাজে যাচ্ছি। নামাজ শেষে বাসায় গিয়ে ঘুমাবো। আজ আর কথা হবে না। কাল সকালে কথা হবে। এ কথা বলেই সজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন মেহের আলী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here