Home Lifestyle কভিড-১৯-এর সংকট: মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যে চাপ ও উদ্বেগও

কভিড-১৯-এর সংকট: মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যে চাপ ও উদ্বেগও

6
0

বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে কভিড-১৯-এর সংকট। এমনিতেই পৃথিবী একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, যেটা মহামারি এসে তরান্বিত করেছে। মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন; সব জায়গায়ই প্রভাব ফেলছে এ মহামারি। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বিগ্নতা ভর করেছে অনেকের ওপর।
এখন আমরা কীভাবে কাজ করব, কোথায় কাজ করব এবং সব শেষ হলে কারা কাজে ফিরে যেতে পারবে, সে নিয়েও আছে অনিশ্চতয়তা। এ সংকট আমাদের ব্যক্তিগত জীবন পদ্ধতি আমূল বদলে দিয়েছে। পাশাপাশি বাড়িয়েছে মানসিক চাপ ও উদ্বেগও।

করোনার কারণে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যে কেমন পরিবর্তন এসেছে, তার একটি হিসাবনিকাশও গবেষকরা এরই মধ্যে প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি ডাটা অনুযায়ী, প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের মাঝে হতাশার নানা উপসর্গ দেখা গেছে। যা কিনা মহামারি-পূর্ব অবস্থার চেয়ে দ্বিগুণ। এটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

আমরা জানি যে দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্য এবং অসুখী অবস্থা কাজের ক্ষেত্রে আমাদের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়। সে সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। বর্তমানে এসে এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যদিও সবাই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

বিশেষ করে ১৬ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে, ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলো অনেক বেশি পরিমাণে বেড়েছে। আবার পুরুষের তুলনায় নারীদের ওপরও এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি।

জার্মান একটি গবেষণা, পিতা-মাতা এবং যারা পিতা-মাতা না, তাদের ভালো থাকার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছে। সেখানে এ বিপর্যয় সম্পর্কে আরো গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেছে গবেষণাটি। এই দুই গ্রুপেরই অবশ্য সংকট-পূর্ব সময়ে একই ধরনের প্রবণতা ছিল, তবে স্কুল ও চাইল্ডকেয়ারগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যারা বাবা-মার দায়িত্ব পালন করছেন তাদের ওপর ব্যাপকভাবে প্রভাব পড়েছে।

তবে এখানেও আবার পার্থক্য তৈরি হচ্ছে অন্যভাবে। বাবাদের চেয়ে মায়েরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিস্তৃত গবেষণা বলছে, যদিও পুরুষের তুলনায় নারীদের চাকরি হারানো আশঙ্কা বেশি ছিল না, কিন্তু মায়েদের বাবাদের চেয়ে পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে অনেক বেশি।

বিশেষত, লকডাউনের কারণে, চাইল্ড বা ডে-কেয়ার সেন্টারগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা এখন শিশুদের দেখভালের পুরো দায়িত্বের মুখোমুখি। এ পরিস্থিতি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ঠেলে দিয়েছে বিপর্যস্ত অবস্থার দিকে।

লকডাউনের শুরুর দিকে লুইজা রোজ নামে এক সোস্যাল মিডিয়া কনসালট্যান্ট ও দুই সন্তানের মা কথা বলেছিলেন এ সময়ে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে। তিনি বলেন, আমি সব সময় হতাশা এবং উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভুগতে থাকি। অফিশিয়ালি আমার মাঝে এ লক্ষণগুলো ধরা পড়ে ১৬ বছর বয়সে। বছরের পর বছর ধরে আমি অনিয়মিতভাবে হতাশা কাটানোর ওষুধ গ্রহণ করেছি এবং সে সঙ্গে আমি থেরাপিও গ্রহণ করেছি।
লুইজা বলেন, আগের স্বামীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভাঙার পর আমি আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছি। এর পরই আমি ভালো হতে শুরু করি। আমি নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেক কিছু নিয়ে এসেছি। আমি বলছি না আমি ভালো হয়ে গেছি, মানসিক স্বাস্থ্য উন্নতির পথে এগিয়ে গেছি।

তিনি আরো বলেন, যেসব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা রয়েছে তারা অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে তিনটায় জেগে উঠি। আমার তিন বছর বয়সী এবং ছয় মাস বয়সী দুটি বাচ্চা আছে। রাতে আমাকে সতর্ক থাকতে হয়, যা আমার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে। আমার স্বামী লক্ষ করেছে যে লকডাউনের প্রথম দুই সপ্তাহে আমার মুখে কোনো হাসিই ছিল না।

এর বাইরেও বাচ্চাদের হোম স্কুলিংয়ের কারণে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে মায়েদের। অনেকেই বলেছেন লকডাউনে বাচ্চাদের পড়ানোর দায়িত্ব নেয়ার কারণে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। মূলত বাচ্চাদের পেছনে তাদের অনেক বেশি সময় দিতে হচ্ছে, সে সঙ্গে ঘরের অন্যান্য দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা মায়েদের জন্য এ সময়ে এসে কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

সন্তান জন্ম দেয়া কি নারীদের জীবনে সবচেয়ে আনন্দের সময়? হয়তো; তবে সব সময় না। নতুন বাবা-মা হওয়া কিংবা হতে যাওয়াদের সব সময় আনন্দের সঙ্গে নানা ধরনের দায়িত্ব ও চাপ নিয়ে আসে। বিশেষ করে মায়েদের জন্য। যার ফলে অনেক ক্ষেত্রে হানা দেয় মানসিক উদ্বেগজনিত সমস্যা। যা কিনা এই লকডাউনের সময়ে এসে আরো বেড়েছে।

বিশেষ করে, নিজের ওপর এবং ভূমিষ্ঠ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা সন্তানের ওপর ভাইরাসের প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রায় সব মা। পাশাপাশি সন্তান জন্ম দেয়ার সময় পাশে কে থাকবে, কীভাবে অন্যের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া যাবে এবং নিজে করোনা আক্রান্ত হয়ে পড়লে কে সন্তানের দেখাশোনা করবে তা নিয়েও ভর করেছে দুশ্চিন্তা। এছাড়া আরেকটি বড় ভয় হচ্ছে নিজে আক্রান্ত হয়ে পড়লে সন্তানকে স্তন্যদান করার বিষয়টি নিয়েও অনিশ্চয়তার মাঝে আছেন অনেক মা।

এদিকে এনএসপিসিসির রিপোর্ট মতে, লকডাউনের প্রথম তিন সপ্তাহে পিতামাতার মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা বেড়েছে আগের চেয়ে ২৮ শতাংশ। মহামারির আগে পাঁচজন মায়ের মাঝে একজন এবং ১০ জন বাবার মাঝে একজনকে অধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে দেখা গেছে। যা এখন এসে নিঃসন্দেহে আরো বেড়েছে। তবে এক্ষেত্রে বাবার তুলনায় মায়েদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে অনেক বেশি।

এখন মহামারি শেষ হওয়া পর্যন্ত এ সমস্যা কমবেশি বহন করতে হবে। তবে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের আরো বেশি মানবিক হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এ সময়ে দায়িত্ব ও চাপগুলো ভাগাভাগি করে নেয়া গেলে তা বাবা-মা ও সন্তান সবার জন্যই হবে মঙ্গলজনক। খবর দ্য গার্ডিয়ান ও টেলিগ্রাফ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here